104 

মুসলিম খান, লন্ডন: হাসপাতালে ঠাঁই নেই। মৃতদের ঠাঁই হচ্ছে না মর্গে। স্ট্রেচার নেই লাশ স্থানান্তরের। লাশভর্তি এম্বুলেন্স থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়ছে লাশ। করোনা রোগীরা হাসপাতালে একটি বেড পেতে হন্যে হয়ে ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে। কিন্তু কোথাও মিলছে না বেড। ভর্তি হওয়া রোগীরা কখন মারা যাচ্ছেন- তা জানতে পারছেন না আত্মীয়স্বজনরা। অনেক হাসপাতালের বাইরে বিক্ষোভ করছেন তারা।

অক্সিজেন সংকটে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে ভারত, বিশেষ করে রাজধানী নয়াদিল্লি, নয়ডা, মুম্বই ও আহমেদাবাদ। মৃতদেহের সৎকার করতে যে কাঠের প্রয়োজন শ্মশানে তার সংকট পড়েছে। ফলে রাস্তার, এমনকি পার্কের গাছ কেটে সেখানে নেয়া হয়েছে বা হচ্ছে। অস্থায়ীভাবে শ্মশান বানিয়ে সেখানে গণহারে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। জ্বলন্ত চিতার পাশে আরো লাশ নিয়ে নামিয়ে রাখা হয়েছে। সারাবিশ্বের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ আক্রান্তের রেকর্ড গড়েছে ভারত। সোমবার জানানো হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন কমপক্ষে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৯৯১ জন। সব মিলিয়ে এক মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে ভারতে।

চরম এক সংকটময় পরিস্থিতি ভারতে। মানুষ রুদ্ধশ্বাসে একটি অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য ছুটছে। কালোবাজারে একটি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে কমপক্ষে ৫০ হাজার রুপিতে। করোনা চিকিৎসার অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ রেমডেসিভির দেখা দিয়েছে চরম সংকট। যে অবস্থা ভারতে বিরাজ করছে এখন তা ভাষায় বর্ণনা করে বোঝানোর নয়।

এনডিটিভিতে প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি এম্বুলেন্সে লাশভর্তি। তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল কোনো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদনের স্থানে বা শ্মশানে। এম্বুলেন্সটি একটি মোড় ঘুরতেই বামদিকে ছিটকে পড়ে একটি লাশ। পাশেই দাঁড়ানো মোটরসাইকেল। দু’একজন মানুষ। লাশ ছিটকে পড়তেই থেমে যায় এম্বুলেন্স। পেছন থেকে ছুটে আসে আরেকটি মোটরসাইকেল। এরপরের ঘটনা কি তা বোঝা যায়নি। তবে কি পরিমাণ মানুষ মারা যাচ্ছে, এম্বুলেন্সভর্তি এসব লাশই তার সাক্ষ্য বহন করে। অনেকে বলেছেন, সরকারিভাবে যে পরিমাণ মানুষ মারা যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, আসলে মারা যাচ্ছে তার কয়েকগুণ।

এ নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় ফলাও করে রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, মর্গ খালি নেই। হাসপাতালে বেড নেই। এম্বুলেন্স থেকে ছিটকে পড়ছে লাশ। শ্মশানে লাশ দাহ করার জন্য মজুত কাঠ ফুরিয়ে গেছে। ফলে লাশ দাহ করার জন্য রাস্তা বা পার্কের গাছ কাটার অনুরোধ জানানো হয়েছে কর্তৃপক্ষের কাছে। অনেক শ্মশান লাশে সয়লাব। তারা আর দাহ করার সামর্থ্য রাখে না। ফলে তাদের অক্ষমতার কথা জানিয়ে দিয়েছে। ওদিকে জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেনের সংকট দেখা দিয়েছে সর্বত্র। এরই মধ্যে বৃটেন, জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্র মেডিকেল সরঞ্জাম পাঠিয়ে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বলা হচ্ছে- ভারতে স্বাস্থ্য খাত ভেঙে পড়েছে। সোমবার টানা পঞ্চম দিনের মতো সারাবিশ্বে একদিনে সংক্রমণের বিশ্বরেকর্ড করেছে ভারত। এদিন মারা গেছেন ২৮১২ জন। এর আগের দিন রোববার সব নাগরিককে টিকা নিতে এবং সতর্কতা বজায় রেখে চলার অনুরোধ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। চিকিৎসক এবং হাসপাতালগুলো তাদের অক্ষমতার কথা নোটিশের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। তারা বলেছেন, যে পরিমাণ রোগী যাচ্ছেন হাসপাতালে তা সামাল দিতে অক্ষম তারা। অনেক হাসপাতালে নোটিশ দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, অক্সিজেন সংকটের জন্য তারা আর রোগী নিতে পারছে না। দিল্লি, মুম্বই, আহমেদাবাদের আইসিইউ বেড রোগীতে পূর্ণ। সেখানে নতুন রোগী গেলেই তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে আক্রান্তের স্বজনরা হাসপাতালে থেকে হাসপাতালে ছুটছেন একটি বেডের জন্য। এটা করতে করতে অনেক সময় রাস্তায়, ফুটপাথেই মারা যাচ্ছেন প্রিয়জন।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতে- এম্বুলেন্স থেকে লাশ পড়ে যাওয়া দেখেছেন তার পরিবার। তারা এ দৃশ্য দেখে কষ্টে, বেদনায়, ক্ষোভে জ্বলছেন। অটল বিহারি বাজপেয়ী সরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে ওইসব লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। রাস্তার ওপর লাশ পড়ে থাকতে দেখে ওই হাসপাতালের বাইরে অন্য রোগীদের অভিভাবকরা তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ শুরু করেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রিয়জন কখন মারা গেছেন, বা মারা যাচ্ছেন তাও জানতে পারছে না তার পরিবার। অনেকে অভিযোগ করেছেন, হাসপাতালগুলোর প্রশাসকরা তাদেরকে তাদের প্রিয়জনকে দেখতে যেতে অনুমতি দিচ্ছেন না। এমনি একজন প্রকাশ লোধি। তিনি ইন্ডিয়া টুডে’কে বলেছেন, আমার আত্মীয় মারা গেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছুই আমাদেরকে বলা হচ্ছে না। আমরা জানি না- তিনি কবে, কখন মারা গেছেন। কেউই কিছু বলছেন না। আমরা হাসপাতালের বাইরে ৪/৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করছি। তবে হাসপাতাল কর্মকর্তারা বলছেন, যেহেতু হাসপাতাল রোগীতে সয়লাব। তাই সেখানে যে কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না তারা।

বিবিসি’র মতে, গত বছর ১৮ই জুন ভারতে রেকর্ড করা হয় ১১ হাজার করোনা আক্রান্ত। এ বছর ১০ই ফেব্রুয়ারি আবার একই সংখ্যক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হন। পরের ৫০ দিন প্রতিদিন নতুন করে করোনায় আক্রান্তের গড় প্রতিদিন ২০ হাজার। এরপরের ১০ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। এ সময়ে গড়ে প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৯ হাজার ৮০০। ফলে বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রথম দফা করোনা যে গতিতে ভারতে বিস্তার লাভ করেছিল, দ্বিতীয় দফায় তার চেয়ে বেশি গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। কেরালা রাজ্যের কোভিড টাস্কফোর্সের সদস্য ড. এ ফাতাহুদ্দিন বলেছেন, আমি ফেব্রুয়ারিতেই বলেছিলাম- করোনাভাইরাস বিদায় নিয়ে যায়নি। এর বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা না নেয়া হলে এই সুনামি আমাদেরকে আঘাত করতে পারে। দুঃখজনকভাবে সেই সুনামি আমাদেরকে আঘাত করেছে। স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে এমন একটা ভাব দেখানো হয়েছে। ফলে দ্বিতীয় সংক্রমণ থামানো যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *