177 

ডেস্ক নিউজ: ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পরিবারের সবাইকে হারিয়ে বেঁচে আছে পাঁচ মাসের ওমরদশকের পর দশক ধরে নির্যাতিত হয়ে আসছেন ফিলিস্তিনিরা। এরই মধ্যে গত এক সপ্তাহে গাজায় যে ইসরাইলি হত্যাযজ্ঞ চলছে তা বর্বরতার সকল মাত্রা অতিক্রম করেছে। ইসরাইলের ক্রমাগত আগ্রাসনে ‘বেঁচে থেকেও বেঁচে নেই’ অবস্থা ফিলিস্তিনিদের। কখন একটি মিসাইল এসে সব উড়িয়ে নিয়ে যাবে এই আশঙ্কা নিয়ে তারা ঘুমাতে যান। প্রতিটা দিনকেই শেষদিন ভেবে কাটাতে হচ্ছে তাদের। গত এক সপ্তাহ ধরে গাজায় ইসরাইলের নৃশংস হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৮০ ফিলিস্তিনি। এরমধ্যে রয়েছে অর্ধশতাধিক শিশু। আহত হয়েছেন আরো সহস্রাধিক ব্যক্তি।

মুসলিমদের কাছে পবিত্র আরবি মাস রমজান শেষে আসে আনন্দের ঈদ। আর এই ঈদের মধ্যেই নিরীহ ফিলিস্তিনিদের টার্গেট করে প্রতিদিন চালানো হচ্ছে শত শত হামলা। এক কথায় গাজাকে সাক্ষাৎ মৃত্যুপুরিতে পরিণত করেছে ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটি।
ইসরাইলের দাবি, তারা শুধু হামাসের অবস্থান টার্গেট করে হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এতো নারী ও শিশুর মৃত্যু কিন্তু অন্য কথা বলছে। ইসরাইল বর্বরতা চালিয়েছে উদ্বাস্তু শিবিরেও। গাজার পশ্চিমে থাকা এমন একটি শিবিরে ইসরাইলি বিমান হামলায় এক পরিবারের ১০ সদস্য নিহত হয়েছেন। সবাইকে অবাক করে শুধু বেঁচে গেছে ওই পরিবারের পাঁচ মাস বয়সী এক শিশু। তবে শিশুটি গুরুতর আহত হয়েছে। গত শনিবার গাজার পশ্চিমে শরণার্থী শিবিরে ইসরাইলি বিমান হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ওই শিশুটির নাম ওমর আল হাদিদি। হামলায় শিশুটির মা, চার ভাইবোন ও স্বজনরা সবাই নিহত হয়েছেন। হামলার সময় শিশুটির বাবা মোহাম্মদ আল হাদিদি বাড়িতে না থাকায় বেঁচে যান। তিনি পরবর্তীতে বলেন, ওই শিবির থেকে কোনো রকেট হামলা চালানো হয়নি। তার পরও কোন অপরাধে তার পরিবারকে এভাবে হত্যা করা হলো! শিশুটি এখনো জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে। বেঁচে গেলেও কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই।

ইসরাইল বলছে, হামাসের হামলায় তাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু এই অজুহাতে তারা গাজায় রক্তবন্যা বইয়ে দিচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না স্কুল, হাসপাতাল কিংবা গণমাধ্যমের কার্যালয়গুলোও। গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে গাজায় থাকা আল-জাজিরা ও বার্তা সংস্থা এপির কার্যালয়। দেশটি দাবি করেছে, গণমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই ভবনটি ব্যবহার করছিল হামাস সদস্যরা। এপি জানিয়েছে, ভবনটিতে হামাসের অফিস থাকার কোনো তথ্য তাদের কাছে ছিল না। যদি এমনটা হয়ে থাকে, তাহলে তার প্রমাণ দিতে হবে ইসরাইলকে। এখনো এই হামলার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটি। অনেকেই মনে করছেন, নিজেদের নৃশংসতা ঢাকতেই এখন গণমাধ্যমকে টার্গেট করতে শুরু করেছে ইসরাইল। এপি থেকে জানানো হয়েছে, ১৫ বছর ধরে এপির ব্যুরো অফিস ছিল এই ভবনটি। কিন্তু কখনো তাদের কাছে এমন কোনো ইঙ্গিত আসেনি বা এমন কোনো কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ হয়নি যে, ভবনটিতে হামাসের অস্তিত্ব আছে বা তারা এই ভবনে সক্রিয় ছিল। তারা এখন সর্বোত্তম প্রচেষ্টা দিয়ে সক্রিয়ভাবে এ বিষয়টি যাচাই করে দেখছেন। ইসরাইলের কাছে এ নিয়ে প্রমাণ চাওয়া হয়েছে।

এদিকে গতকাল ইসরাইলের এক হামলায় সর্বোচ্চ ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। এরমধ্যে অন্তত ৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা। গত ক’দিন ধরে যে তাণ্ডব চলছে তার মধ্যে এবারই প্রথম এক হামলায় এতো মানুষ নিহত হলেন। ইসরাইলকে টার্গেট করে রকেট হামলা জারি রেখেছে সশস্ত্র সংগঠন হামাসও। গত এক সপ্তাহে প্রায় ৩ হাজার রকেট হামলা চালানো হয়েছে ইসরাইলের অভ্যন্তরে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম প্রায় ৯০ ভাগ রকেটই থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। দেশটির গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, যেন ঈশ্বর নিজে নেমে এসে ইসরাইলকে রক্ষা করছেন। তারপরও দেশটিতে এখন পর্যন্ত ১০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক ইসরাইলি।

গতকালই এক হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় গাজায় হামাস প্রধান ইয়াহইয়া আল সিনওয়ারের বাড়ি। হামাসের আল আকসা টেলিভিশনের এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। তবে হামাস প্রধান আহত কিংবা নিহত হয়েছেন কিনা তা জানায়নি সংগঠনটি। ইয়াহইয়া আল সিনওয়ার ২০১৭ সাল থেকে গাজায় হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক শাখার নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

গতকালের চলমান ইসরাইল-হামাস সংকট নিয়ে আবারো আলোচনায় বসতে যাচ্ছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ইতিমধ্যে তেল আবিব পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলিস্তিন ও ইসরাইল সম্পর্কবিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি হাদি আমর। যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ এবং মিসরের দূতেরা পরিস্থিতি শান্ত করতে কাজ করছেন। তবে বাস্তবে দেখা গেছে সংঘাত আরো জোরদার হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করেছেন। তিনি ইসরাইলের আত্মরক্ষার দাবিকে সমর্থন জানিয়েছেন। অপরদিকে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টকে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে শুরু হয় সামপ্রতিক এই সংঘাত। আল-আকসা মসজিদে ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানান ফিলিস্তিনিরা। সেই আন্দোলন দমন করার সময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আহত হন বেশকিছু ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি পুলিশ। তবে পশ্চিম তীরের এমন ঘটনার প্রেক্ষিতে ইসরাইলি শহরগুলো টার্গেট করে রকেট হামলা চালাতে শুরু করে হামাস। এতে এক ইসরাইলি নিহত ও কয়েকজন আহত হন। এ হামলার জবাবে ইসরাইল গাজায় তাণ্ডব শুরু করে। এরপর টানা ৭ দিন ধরে চলছে হামলা-পাল্টা হামলা। এখনো সংঘাত বন্ধের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *