196 

সাঈদ চৌধুরী:  তথ্য সংগ্রহে বা ব্যবসা সম্প্রসারণে মিডিয়ার ভূমিকা চিরায়ত। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি বিলবোর্ড এবং প্রচারপত্র বাণিজ্যিক প্রসারে সহায়ক ছিল। মিডিয়া শুধুমাত্র ঘটনা-দুর্ঘটনা বা তেজারতি-কারবার জানার মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মেধা বিকাশের সিঁড়ি, বিনোদনের হাতিয়ার এবং অধিকার আদায়ের মুখপাত্র হিসেবেও বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

প্রযুক্তির বদৌলতে জগতব্যাপী মিডিয়ায় দ্রুত অনেক পরিবর্তন এসেছে। সারাবিশ্ব এখন সত্যিকার অর্থে গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রাম। ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমেই এই বিপ্লব ঘটেছে। বর্তমান সময়কে বলা হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। গণমাধ্যমকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ইত্যাদি।

ছোট্ট একটি সেলফোন হয়ে উঠেছে সবকিছুর চালিকা শক্তি।

এক সময় গণমাধ্যম বলতে ছিল ‘সংবাদপত্র’। তারপর আসল রেডিও এবং সময়ের ব্যবধানে যুক্ত হল টেলিভিশন। এখন প্রাত্যহিক ব্যবহৃত হাতের মোবাইল ফোনটিও গণযোগাযোগের মাধ্যম। ইন্টারনেটের বদৌলতে কোটি কোটি মানুষের অংশ গ্রহনে সোশ্যাল মিডিয়া নবজাগরণের সৃষ্টি করেছে।

কাগজে ছাপা সংবাদপত্রের ইতিহাসও কয়েকশ বছরের। সময়ে সময়ে অনেক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয়েছে। তবে রঙচঙে আধুনিক ডিজাইনের পত্রিকার ইতিহাস খুব বেশি কালের নয়। ধর্মীয় বার্তা প্রদানের মাধ্যমে মূলত সংবাদ প্রেরণের সূচনা হয়। মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামের সময়ের তথ্যপত্র তার প্রমান। আধুনিক সংবাদপত্রের ধারণা মোতাবেক ছাপা কাগজ শুরু হয় ১৬০৫ সালে জার্মানিতে। বাংলায় প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় অষ্টাদশ শতকে। তবে ১৯৪৭-এ ভারত ভাগের পর থেকে বাংলা সংবাদপত্রে নান্দনিকতার সূচনা হয়।

আটলান্টিকের ওপারে প্রথম বেতার সংকেত পাঠান এবং পাল্টা সংকেত গ্রহণ করেন মার্কনি নামের প্রযুক্তি ব্যবসায়ী ১৯০১ সালে। এটাকে প্রথম বেতার বার্তা হিসেবে মনে করা হয়। যদিও তারও আগে ১৮৯৯ সালে বাংলার জগদীশচন্দ্র বসুর সাথে মার্কনির যোগাযোগ স্থাপনের একটি তথ্য সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এটি দিয়েছেন খোদ মার্কনির নাতি পারসেশচে মার্কনি। যিনি ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরির জ্যেষ্ঠ জ্যোতির্বিদ।

২০১৮ সালের নভেম্বরে জগদীশচন্দ্র বসুর জন্ম বার্ষিকীতে বসু ইনস্টিটিউট আয়োজিত ‘মার্কনি, বসু এবং টেলিকমিউনিকেশন বিপ্লব’ শীরোনামের বক্তৃতায় পারসেশচে মার্কনি এই খবর দেন। এছাড়া ১৯৯৭ সালের ৩১ অক্টোবরের দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনেও জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি অনুসন্ধানে মার্কনি যে ডিটেক্টর ব্যবহার করেছেন, তার আবিষ্কারক ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। এ প্রতিষ্ঠান বসুকে রেডিও বিজ্ঞানের জনক বলে অভিহিত করে।

টেলিভিশন খুব বেশিদিন আগের নয়। গ্রিক শব্দ Tele অর্থ দূরত্ব আর ল্যাটিন শব্দ Vision অর্থ দেখা। এই দুই ভাষার দুটি শব্দ মিলে Television হয়েছে । বাংলায় এটাকে দুরদর্শন যন্ত্র বলা হয়। ১৮৬২ সালে তারের মাধ্যমে প্রথম স্থির ছবি পাঠানো সম্ভব হয়। এরপর ১৮৭৩ সালে বিজ্ঞানী মে ও স্মিথ ইলেকট্রনিক সিগনালের মাধ্যমে ছবি পাঠনোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন লোগি বেয়ার্ড ১৯২৬ সালে প্রথম টেলিভিশন আবিষ্কার করেন। এরপর রুশ বংশোদ্ভুত প্রকৌশলী আইজাক শোয়েনবারগের কৃতিত্বে ১৯৩৬ সালে প্রথম টিভি সম্প্রচার শুরু হয়। বিশ্বে প্রথম বাণিজ্যিক ভাবে টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু করে বিবিসি। বাংলাদেশে টেলিভিশন যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর।

২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে চালু হয় ফেসবুক ইনক। ব্যবহারকারীগণ বন্ধু সংযোজন, বার্তা প্রেরণ এবং তাদের ব্যক্তিগত তথ্যাবলী হালনাগাদ ও আদান-প্রদান করতে শুরু করেন। মার্ক জাকারবার্গ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালীন তার কক্ষনিবাসী ও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ের ছাত্র এডুয়ার্ডো স্যাভেরিন, ডাস্টিন মস্কোভিত্‌স এবং ক্রিস হিউজেসের যৌথ প্রচেষ্টায় ফেসবুক নির্মাণ করেন। সারা বিশ্বে বর্তমানে ২৫০ মিলিয়ন মানুষ সক্রিয় ভাবে ফেসবুক ব্যবহার করছেন।

২০০৫ সালে চালু হয় ইউটিউব চ্যানেল। দ্রুত সাড়া জাগায় এবং টেলিভিশনের সাথে পাল্লা দিতে থাকে। টিভি চ্যানেলের বিজ্ঞাপনের অসহ্য জ্বালাতন সইতে না পেরে দর্শক ইউটিউব চ্যানেলের দিকে ঝুকতে থাকেন। নিত্য নতুন ভিডিও দেখে অল্প দিনে ইউটিউব চলে আসে দর্শকদের পছন্দের তালিকায়। ফেসবুকও চালু করে ভিডিও আপলোড সহ লাইভ টিভি প্রোগ্রাম সুবিধা।

জীবন যেভাবে ছুটছে দ্রুত গতিতে, সেভাবেই গণমাধ্যম এগিয়ে চলেছে দুরন্ত গতিবেগে। অনলাইন মিডিয়া তথা ডিজিটাল মিডিয়ার চাহিদা এবং গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে ৷ গ্রাম-গন্জের মানুষ যখন অধিকারের জন্য লড়ে, সংবাদ মাধ্যমে তার তেমন গুরুত্ব দেয়া হত না। এখন সবই অনলাইন মিডিয়ায় চলে আসে। খবর হয়ে যায় সর্বত্র। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় সংবাদ মাধ্যম নড়ে চড়ে বসে। সামান্য হলেও অধিকার ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয় নিভৃত পল্লীর সাধারণ মানুষ।

আমরা এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে আজ এক নতুনতর সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। অনেকেই অনলাইন মিডিয়ার জন্য নীতিমালার কথা বলছেন। আসলে লাইসেন্সিংয়ের একটাই নীতিমালা সব মিডিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে মিডিয়া হাউস গুলোর নিজস্ব প্রকাশভঙ্গী বা কোনো নেতিবাচক শক্তির কাছে বিবেক বন্ধক রেখে থাকলে তার দায় নিশ্চয়ই গোটা গণমাধ্যমের নয়। যুক্তরাষ্ট্র উইকিলিকসকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। এ থেকেই শিক্ষা নেয়া উচিত।

অনলাইন মিডিয়া একেবারে টাটকা ও গরমাগরম খবরটি প্রকাশ করে অন্যদের সামনে চ্যালেন্জ ছুড়ে দিয়েছে। অনলাইন মিডিয়ার ব্যাপ্তি বিশাল, যার মধ্যে অনলাইন ডেইলি থেকে শুরু করে সোস্যাল মিডিয়া যেমন ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি যুক্ত। মোবাইল ফোনের সুবাদে বাংলা ভাষায় অনলাইনে সংবাদপত্র পাঠকের সংখ্যাও কয়েক কোটি ছাড়িয়েছে।

অনলাইন গণমাধ্যমের অসীম ব্যাপকতা, বিশাল সম্ভাবনা ও বহুমাত্রিক বৈশিষ্টেরে কারণে বিশ্বের সর্বত্র তা দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। সনাতনী গণমাধ্যমকেও সময়ের বাস্তবতায় অনলাইন কার্যক্রম জোরদার করতে হচ্ছে। অন্যতায় টিকে থাকা মশকিল হবে। এক যুগ আগেও যারা এটি অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন,  তাদের জারিজুরি শুধু খর্ব হয় নাই, কোথাও কোথাও মুখ থুবড়ে পড়েছে। সংবাদের চিরাচরিত প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নান্দনিতকার জয় জয়কার ঘটছে অনলাইন গণমাধ্যমে। প্রতিনিয়ত নির্মিত, বিনির্মিত হচ্ছে নতুন অনেক কিছু। দ্রুততম সময়ে সংবাদ প্রদান, খবরের নতুনত্ব ও নান্দনিকতা সৃষ্টিই হচ্ছে অনলাইন গণমাধ্যমের দর্শন।

গত ১০ বছরে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। অনলাইন মিডিয়া বা স্যোশাল মিডিয়া পুরো ক্যানভাসটাকে চেঞ্জ করে দিয়েছে। একজন মানুষ তার ইচ্ছা অনুভূতির যে কোন তথ্য স্যোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ করতে পারে। এ নিয়ে হয়ত অনেক সময় বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। তাই সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। সত্যিকার অর্থে কাজ করতে পারবে বা কাজ করার সামর্থ্য রাখে তাদের এগিয়ে নিতে ঐক্যবন্ধ প্রয়াস প্রয়োজন। আর এলক্ষেই যাত্রা শুরু করেছে অনলাইন টিভি ক্লাব ইউকে।

সাংবাদিকদের দলীয় কর্মী বা কালো টাকার হাতিয়ার  হওয়া উচিৎ নয়। তাই সাংবাদিকদের পেশা ও জীবন জীবিকার নিরাপত্তার জন্য ঐক্যের বিকল্প নেই। পেশাজীবীরা যখন রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক ভাবে বিভাজিত হয়ে পড়েন, তখন সামাজিক সুবিচার ও দেশের গণতন্ত্র  হুমকির মুখে পড়ে।

ব্রিটেন থেকে বাংলাদেশী কতৃক পরিচালিত অনলাইন গণমাধ্যমকে সময়ের চাহিদা পুরণে স্বার্থক ও সফল করে তুলতে গঠিত হয়েছে ‘অনলাইন টিভি ক্লাব ইউকে’। গত ২১ নভেম্বর শনিবার দুপুরে অনলাইন গণমাধ্যমের পরিচালক ও সাংবাদিকদের নিয়ে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. হাসানাত এম হোসাইন এমবিই, বিশিষ্ট সাংবাদিক-কলামিস্ট কে এম আবু তাহের চৌধুরী এবং চ্যানেল এস টিভির ম্যানেজিং ডাইরেক্টর তাজ চৌধুরী।

আরটিএন বাংলা টিভির সিইও নুরুল আমিন তারেকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, এমএএইচ টিভির সিইও মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ টিপু। অনলাইন মিডিয়ার পক্ষে আলোচনায় অংশ গ্রহন করেন, সময় সম্পাদক সাঈদ চৌধুরী, কিংন্ডম চ্যানেল এর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী, টিভি ৩ বাংলা ম্যানেজিং ডাইরেক্টর নাশেদ রহমান, জালালাবাদ টিভির সিইও আনোয়ার শাহজাহান, লন্ডন এলবি টিভির আলাউর রহমান শাহীন, দর্পন টিভির চেয়ারম্যান রহমত আলী, ইউকে বিডি টিভির মনসুর মুকিস, হাওয়া টিভির মাহমুদুর রহমান শানুর, মুক্তবাংলা অনলাইন চ্যানেলের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মো: সারওয়ার হোসাইন, পিভি টিভির পরিচালক দেলওয়ার হোসেন শিবলী, এমএস টিভি ইউকের চেয়ারম্যান মুসলিম খান, ইউকে কসবা টিভির চেয়ারম্যান সৈয়দ মাসুক, এমএস টিভির পরিচালক শামীমুল হক, একুশে জার্ণাল টিভির চেয়ারম্যান মাসরুর আহমদ বুরহান, এসএ টিভির চেয়ারম্যান মো: আনিসুর রহমান, টাইম নিউজ ফখরুল হোসেন, ব্রিটিশ বাংলা অনলাইন টেলিভিশনের চেয়ারম্যান জামাল আহমদ, সিলেট ৭১ ইবশা আহমদ চৌধুরী প্রমুখ। অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহনকারী সকলকে নিয়ে এই ক্লাব গঠন করা হয়।

অনলাইন টিভি ক্লাব ইউকের প্রারম্ভিক আলোচনায় বলা হয়, আজ থেকে অর্ধ শতাধিক বছর আগে ১৯৬৪ সালে কানাডীয় সমাজ বিশেষজ্ঞ মার্শাল ম্যাকলুহান যে ‘গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রাম’ ধারণার কথা বলেছিলেন, তার বাস্তব রূপায়ন হচ্ছে ইন্টারনেট কেন্দ্রিক আজকের ডিজিটাল মিডিয়া বা অনলাইন গণমাধ্যম।

অনলাইন গণমাধ্যমের অসীম ব্যাপকতা, বিশাল সম্ভাবনা ও বহুমাত্রিক বৈশিষ্টের কারণে বিশ্বের সর্বত্র তা দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। অনলাইন গনমাধ্যেম সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নান্দনিতকার জয়জয়কার ঘটাচ্ছে। প্রতিনিয়ত নির্মিত, বিনির্মিত হচ্ছে নতুন অনেক কিছু। দ্রুততম সময়ে সংবাদ প্রদান, খবরের নতুনত্ব ও নান্দনিকতা সৃষ্টিই হচ্ছে অনলাইন গণমাধ্যমের দর্শন।

অনুষ্ঠানে প্রাথমিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবার জন্য মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ টিপু, নুরুল আমিন তারেক, মো: সারওয়ার হোসাইন, আনোয়ার শাহজাহান, মুসলিম খান, মাহমুদুর রহমান শানুর মাসরুর আহমদ বুরহান, দিলওয়ার হোসেন শিবলীকে মনোনীত করা হয়।

অনলাইন টিভি ক্লাব ইউকে আন্তর্জাতিক ব্রডকাস্টিং নীতিমালা পর্যালোচনা, পেশাগত ও কারিগরি মান বৃদ্ধি, নারী-পুরুষ বৈষম্য দূরীকরণ,সাংবাদিকদের সুসংগঠিত করে উক্ত ক্লাবের মাধ্যমে যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *