142 

শায়েখ আব্দুস সালাম আল মাদানীঃ

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
সুধী পাঠক,
রামাদ্বানুল মুবারাকের শেষ দশকের এ ক্ষুদ্র প্রবন্ধটি একটি আত্মপর্যালোচনা মূলক নিবন্ধ । কাউকে ছোট করা,ছিদ্রান্বেষন করা,কারো পদস্খলন বা পরাজয়ে খুশী হওয়া নয় । আত্ম উপলব্ধি জাগরিত করে সঠিক পথে পথচলায় ব্রতি হওয়া এবং সংশোধনবাদী দৃষ্টিকোন থেকে লিখা ।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কালামে পাকে বিভিন্ন ঘটনাবলী বর্ণনা করে “ফা-তাবিরু ইয়া উলিল আলবাব” “ফাসলিহু বাইনা আখওয়াইকুম” ইত্যাদি নির্দেশনা দিয়েছেন । মানবতার বন্ধু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন “এক মুসলিম অপর মুসলিমের আয়না স্বরুপ” বলেছেন “দ্বীন হলো নসীহতের নাম” ।
পাঠক বন্ধুরা লিখাটি এ দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করবেন বলে অনুরোধ। কারন “বন্ধু সেই সংশোধনে হয় যে সহায়” ।
আমি মনে করি চলমান কয়েক বছরে বিভিন্ন দরবারের পীরজাদা,সাহেবজাদা,শায়েখজাদা ও বিভিন্ন দ্বীনি মাদারিস সমূহের শায়েখগন,হেফাজতে ইসলাম ও ক্বাওমী বলয়ের সম্মানীত উলামায়ে কেরাম, মুফাসসির ও ওয়াইজগনের মধ্যকার চলমান ঘটনা প্রবাহ নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোন থেকে পর্যালোচনা করতঃ শিক্ষা গ্রহন ও সংশোধন অতীব জরুরী । ক’টি উদাহরনঃ
উদাহরণ ১ পশ্চিম বঙ্গের ফুরফুরা শরীফ একটি স্বনামধন্য দরবার । এর সম্মানীত অনেক পীর সাহেবান উভয় বাংলায় শত শত বছর থেকে দ্বীনি তা’লিম তরবীয়াতের কাজ করে আসছেন । সে পরিবারের ভাইজান বলে খ্যাত একজন পীরজাদা পূর্ব পুরুষদের মতো ধর্ম সভায় ওয়াজ নসীহত করে বেড়াতেন । ভালো বক্তা, মাহফিলেও বাপ দাদাদের বংশানুক্রমিক মুরীদানদের প্রচুর সমাগম ঘটে । হঠাৎ করে রাজনীতির শখ হলো । ধর্মীয় শিক্ষার বিপরীত অবস্থান নিয়ে গঠন করলেন ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল “ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট” । জোট করলেন কম্যুনিষ্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়ার সাথে । নির্বাচন হলো,ব্যতিক্রম একটি আসন ছাড়া সব আসনে জয় তো পেলেনই না বরং জামানতও বাজেয়াপ্ত ।
উদাহরণ ২ বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলের একটি স্বনাধন্য দরবার শরীফ । তাদের বার্ষিক মাহফিলে প্রচুর মুরীদানের সমাগম ঘটে । তাদের ভাষায় কোটি কোটি লোকের উপস্থিতি । রাজধানীতে মিটিং মিছিলেও উপস্থিতি ঘটে প্রচুর । দরবারের কর্ণধার শায়েখ পীরজাদাগন মা’শা আল্লাহ আবার অনেকেই মুফতি লক্ববধারী । ভালো বক্তা,সামনে প্রচুর মুরীদান শ্রোতা । চিৎকার করে বক্তৃতা করতেও পারদর্শী । আর প্রতিপক্ষকে ফতোয়ায় ফতোয়ায় ভাসিয়ে দেওয়া তো অতি নগন্য ব্যাপার । সুতরাং আর কে আটকায় । ক্ষমতার একদম কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন । বিগত নির্বাচনে প্রায় তিনশো আসনে প্রার্থী দিলেন ,কিন্তু সবকটি আসনেই বেচারাদের জামানত বাজেয়াপ্ত । বিভিন্ন ইস্যুতে গরম গরম বক্তৃতা করে চুপ হয়ে যাওয়া অথবা শক্তিশালীদের ডান্ডার ভয়ে আপোষকামীতার পথ বেছে নেওয়া তাদের অন্যতম খাছলত ।
উদাহরন ৩ বৃহত্তর সিলেটের একজন স্বনামধন্য পীর সাহেব যার দ্বীনি খিদমাত অতুলনীয় । বিশেষ করে কোরআনুল কারীমের খিদমাত,মাদারিস প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ইতিহাসে স্বরনযোগ্য বটে । তার ইন্তিকালে জানাযায় কয়েক লক্ষ লোকের সমাগম ঘটে। বার্ষিক ওরসে ও লক্ষ লোকের উপস্থিতি ঘটে । এগুলো সাহেবজাদাদের কতিপয়কে উচ্চাভিলাষী করে তুলে । তাদের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বৃহত্তর সিলেটে জেলার কয়েকটি আসনে প্রার্থী দেয় । খোদ একজন সাহেবজাদাও প্রার্থী হলেন । নির্বাচনে সবকটিতে পরাজিত এমনকি জামানতও বাজেয়াপ্ত । এমনকি মরহুম পীর সাহেবের জীবদ্দশায় তার আসনে তার আদর্শিক বিরোধী দুটি ইসলামী দল দু’বার জয়লাভ করলেও তার মনোনীত প্রার্থী সেখানে ও পরাজিত হয়েছেন ।
উদাহরন ৪ তিনি প্রখ্যাত একজন শায়খুল হাদীসের সন্তান । ভালো বক্তা,গলার স্বর খুব উঁচু । নিজস্ব বলয়ের কিছু শ্রোতা ও মাদরাসা ছাত্রের সমাবেশ ঘটে তার মাহফিলে,জনসভায় । আর যায় কোথায় ! যা তার দায়িত্ব নয়, যে কাজ করা তার পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়,যা করতে শরীয়াহ তাঁকে বাধ্য করে নি । এগুলো করবেন,ওগুলো করতে দেবেন না ইত্যাদি বাগাড়ম্বর করলেন । ফলশ্রুতিতে বোকামী হোক বা পাতানো ফাঁদে অজান্তে পা দিয়েই হোক, আজ তিনি বড্ড অসহায় । উল্লেখ্য তার মরহুম পিতা যাদের সাথে প্রায় এক দশক জোটবদ্ধ রাজনীতি করছেন তাদের সাথেও তিনি একত্রে রাজনীতি করতে অনীহা প্রকাশ করেন ।উদাহরন ৫ তিনি শায়খুল ইসলামের সন্তান । বাবা দেশের শ্রেষ্ঠতম দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার । বিশাল একটি দ্বীনি সংগঠনের আমীর । সন্তান কি আর সামান্য কেউ ? লোভ আর স্বেচ্ছাচারীতা তাঁকে পেয়ে বসলো । স্বেচ্ছায় হোক আর বোকামীতে হোক,কুচক্রীদের পাতানো ফাঁদে পা দিলেন । বাবার সাথী,সহচর,ছাত্রদেরকে বাবা হত্যার কথিত মামলায় ফাঁসিয়ে দিলেন । জানি না এর শেষ কথায়,কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়, আল্লাহ মা’লুম ।

প্রসঙ্গ তাবলীগ,হেফাজত ও বেফাকুল মাদারিসঃ
বিগত বছর দুয়েকের মধ্যে দাওয়াতের ময়দানে কর্মরত তাবলীগ জামায়াত নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্যের কারনে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে । একে অপরের বিরুদ্ধে ফতোয়া,হামলা,মসজিদ দখল এমনকি খুনোখুনির ঘঠনাও ঘটেছে । তাদের ছয় উসুলের অন্যতম উসুল “ইকরামুল মুসলিমীন” নিজেদের দলাদলিতে বিধ্বস্ত । অবাক বিস্ময়ে সারা বিশ্ব তা অবলোকন করছে।

সম্প্রতি নিজেদের হাতে কামানো কিছু অনাকাঙ্খিত ঘটনা প্রবাহের প্রেক্ষিতে বিচলিত,আতংকিত হেফাজত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেদের কমিটি বিলুপ্ত করেছে । সমস্ত কার্যক্রম গুটিয়ে নিজেদেরকে জেল জুলুম অত্যাচার থেকে বাচানোর জন্যে ক্ষমতাশালীদের দুয়ারে দুয়ারে ধর্ণা দিচ্ছে । বলা যায় তারা নিজেরা আত্মহত্যা করেছে ।

ক্বাওমী মাদারিস সমূহের কেন্দ্রীয় বোর্ড বেফাকুল মাদারিস সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহে বিচলিত হয়ে তাদের মাদরাসা সমূহে রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে । প্রশ্ন জাগে তাহলে ইসলামে রাজনীতি কি শরীয়ত সম্মত নয় ? যদি তা-ই হয়,তবে এতো দিন কি করে তা জায়েয ছিলো ? মূলত এটি তাদের আকাবীরদেরই দেখানো পথ । যা সেই ব্রিটিশ পিরিয়ড থেকে ধর্ম নিরপেক্ষ মতাদর্শের সাথে বসবাস,যোগসাজশ,আপোষকামীতার বহিঃপ্রকাশ বলা যায় ।
সুধী পাঠক,এ ব্যাপারে বেশী কিছু লিখতে চাই না । আমরা সীমাতিক্রমে বিশ্বাসী নই,বাগাড়ম্বরকারী আবেগী নই । আমরা বাস্তব বাদী,নিয়মতান্ত্রিকতা বাদী,কৌশলী,জোর জবরদস্তীতে বিশ্বাসী নই । আমরা কথা কম কাজ বেশী ওয়ালাদের সাথে থাকতে চাই।
নাসিহাহ
সংকীর্ণতা,অনৈক্যতা,ছিদ্রান্বেষন,গীবত পরিহার করুন । “ইত্তেফাক মা’য়াল ইখতিলাফ” এর সংজ্ঞায় একত্রিত হয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দ্বীন কায়েমের প্রচেষ্ঠা জোরদার করুন ।
মুরীদ আর ভোটার এক নয় । তাই মুরীদ সংখ্যা,বড় বড় মাহফিল, কচিকাচা মাদরাসা ছাত্রদের বিপুল সমাবেশ ইত্যাদি দেখে আত্মশ্লাঘায় ভুগবেন না । আত্মম্ভরিতা, আত্ম অহংকারে ডুববেন না । নিজেই একমাত্র বড় আলেম,বড় মুফতি,বড় শায়খুল হাদীস এ মানসিকতা পরিহার করুন ।
পৌনে এক শতাব্দি থেকে আল্লাহর জমিনে খিলাফাহ আলা মিনহাজিন নাবুওয়াহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে কর্মরত সংগঠন যেটি জেল,জুলুম,অত্যাচার,শাহাদাহ,ফাসি ইত্যাদি ত্যাগের নাজরানা পেশ করেছে, কথায় কথায় এদের নবীর দুশমন,সাহাবা বিদ্বেষী,আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত থেকে খারিজ,কম্যুনিস্টদের চেয়ে ভয়ংকর,বেয়াদব,বে আমল,উশৃংখল ইত্যাদি গীবত,পরনিন্দা পরিহার করুন । নিজেদের আক্বীদা,আখলাক, আমল,মুয়ামালাত সংশোধন করুন। নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বলয়কে গোটা বিশ্ব ভাববেন না। অপরের স্বরুপ উদ্ঘাটন নয়,আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখুন। জিহবার মলিনতা পরিষ্কার করুন। অতীতের বাড়াবাড়ির জন্য ইস্তেগফার করুন । আগামীতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার শপথ নিন । সর্বোপরী সর্বাবস্থায় লা শারীক আল্লাহকে ভয় করুন।
আল্লাহ আমাকে সহ সবাইকে সত্য জানার,মানার তৌফিক দান করুন,আমীন।

লেখক: অধ্যক্ষ, গোবিন্দনগর ফজলিয়া ফাজিল(ডিগ্রী)মাদ্রাসা,ছাতক,সুনামগঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *