563 

ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত কার্যকর করতে হবে

দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক নারী ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল সারাদেশ। সিলেটে এমসি কলেজের ক্যাম্পাসে ধর্ষণের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি এবং নোয়াখালির বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে লাঞ্ছিত করার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ধর্ষণের বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি এবং প্রতিবাদে রাজধানীসহ পুরো দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেই প্রতিদিন নারী ও শিশু ধর্ষণের নতুন নতুন ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে আসছে। প্রতিবাদী মানুষ ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড এবং দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছে। এহেন বাস্তবতায় সরকার প্রচলিত আইনে কিছু পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডের বিধান কার্যকরের উদ্যোগ নিয়েছে। গত সোমবার মন্ত্রী পরিষদের ভার্চুয়াল সভায় ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড এবং ৬ মাসের মধ্যে মামলার কার্যক্রম শেষ করার বিধান সম্বলিত (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন সংশোধন-২০২০) আইনের খসড়া মন্ত্রীসভায় অনুমোদন করা হয়েছে। অনতিবিলম্বে এটি প্রেসিডেন্টের অধ্যাদেশের মাধ্যমে মঙ্গলবারই কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। মৃত্যুদন্ডের বিধান নিয়ে বিশ্বে বিতর্ক থাকলেও পরিস্থিতির কারণে এই আইন করতে হয়েছে বলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন।

বলা বাহুল্য, আইনগত কঠোরতার চেয়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগ বা বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না করে শুধু আইন তৈরী করে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব নয়। দেশের আইনবিদরা বলছেন, প্রচলিত নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে আগে থেকেই ৭টি ধারায় মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে। এখন আইনটির সংশোধনীতে আরেকটি ধারায় মৃত্যুদন্ডের বিধান যুক্ত হওয়ায় আইনে মৃত্যুদন্ডের ধারা দাঁড়িয়েছে ৮টি। তবে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন ও নারী ধর্ষণ ক্রমবর্ধমান হারে বাড়লেও কখনো নারী ধর্ষণের দায়ে কোনো ফাঁসি বা মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ার নজির নেই বললেই চলে। এমনকি বছরের পর বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও শাস্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে না। এর ফলে, এক ধরণের দায়মুক্তির প্রবণতা সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি আইনগত জটিলতা এবং ফাঁকফোড়ে পার পেয়ে যাওয়া অপরাধিরা আরো বেপরোয়া হয়ে অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। সমাজতাত্তি¡ককরা এ পরিস্থিতিতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বলে উল্লেখ করছেন। তবে শাস্তি যত কঠোর হয় অপরাধির নির্দোষ প্রমানীত হওয়ার হারও নাকি বেড়ে যায়। আইনের পরিবর্তন এনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবনের পরিবর্তে মৃত্যুদন্ডের বিধানের ফলে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্তদের সাজা শতকরা এক ভাগেরও নিচে নেমে যেতে পারে বলে দেশের আইনবিদরা মনে করেছেন।

শুধু আইন দিয়ে সর্বব্যাপী সামাজিক অবক্ষয় ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ণের সমাধান সম্ভব নয়। সর্বাগ্রে প্রয়োজন আইনের শাসন নিশ্চিত করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফ থেকে দলনিরপেক্ষ ও দুর্নীতিমুক্তভাবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ বা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল এটা নিশ্চিত হতে পারে। হত্যা-ধর্ষণের মত গুরুতর আপরাধের ঘটনা কমবেশি সবখানে সব সময়ই ছিল, এখনো আছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে অধিকাংশ নারী নির্যাতন বা চাঞ্চল্যকর নারী ধর্ষণের ঘটনার সাথে সরকারি দলের পরিচয়ধারি বা ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে। এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে, ধর্ষকরা নিজেদের আইণের ঊর্ধ্বে ভাবতে পারছে বলেই আইনের কঠোরতা এবং প্রয়োগকে তোয়াক্কা করছে না। ফলে আইনের কঠোরতা চেয়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং বিচারিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সাথে ধর্ষণ-দুর্নীতিসহ সামাজিক অবক্ষয়ের মূল কারণগুলোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতির বন্ধন এবং তথাকথিত প্রভাবশালী মহলের প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষপাত মূলক আচরণ চিরতরে বন্ধ করতে হবে। সমাজে নীতি নৈতিকতার স্খলণ ও অবক্ষয়ের কারণ হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-অভিভাবক ও সমাজের মুরুব্বিদের আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এই মুহূর্তে দ্রুততম সময়ে বিচার কাজ নিষ্পত্তির আইনগত বাধ্যবাধকতা ও ধর্ষণ-নির্যাতনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দৃষ্টান্ত স্থাপনের মধ্য দিয়ে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে।(সম্পাদক: মোহাম্মদ রুহুল আমিন)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *