209 

উচ্চপদস্থ আমলাদের মাস্তানসুলভ আচরণ!

‘কুড়িগ্রামের ডিসি প্রত্যাহার’ শীর্ষক একটি সংবাদ গতকাল গনমাধ্যমে এবং সোসাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। সংবাদটি ইতোমধ্যে গোটা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। শহর ও নগরীগুলোতে সচেতন মহলসহ সকল স্তরের শিক্ষিত মানুষের মাঝে সংবাদের ঘটনাটি ‘টক অব দ্য টাউন’ হয়ে ওঠেছে।

এতে বলা হয়েছে, মধ্য রাতে বাড়ির দরোজা ভেঙ্গে ধরে এনে নির্যাতনের পর ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে কারাদন্ড দেয়া অনলাইন নিউজ পোর্টার বাংলা ট্রিবিউন-এর কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগানকে জামিন দেয়া হয়েছে।
গত রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের আদালতে জামিনের পর দুপুর ১২টার দিকে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। এরপর তাকে হাসাপাতালে ভর্তি করা হয়। তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ধরে আনার পর তাকে এককাউন্টারে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয় বলে হাসপাতালে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন আরিফুল।

সংবাদে আরো বলা হয়েছে, এভাবে একজন সাংবাদিককে ধরে এনে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে কারাদন্ড দেয়ার ঘটনায় জেলা প্রশাসকের সম্পৃক্ততা ও তার আচরণে অসঙ্গতির প্রমাণ পাওয়ায় কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোছাঃ সুলতানা পারভীনকে গত রোববার প্রত্যাহার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী।

এদিকে আরিফুল ইসলামকে আটকের বিরুদ্ধে গত রোববার করা এক রীট আবেদনের শুনানীকালে হাইকোর্ট বলেন, একজন সাংবাদিককে ধরতে মধ্যরাতে তার বাসায় ৪০ জনের বিশাল বাহিনী গেলো, এতো বিশাল ব্যাপার। তিনি কি দেশের সেরা সন্ত্রাসী?

জামিনে মুক্ত হওয়ার পর নির্যাতনের ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে আরিফুল বলেন, শুক্রবার রাত ১২টার পর কেউ একজন বাড়ির দরোজায় ধাক্কা দেয়। পরিচয় জানতে চাইলে কেউ পরিচয় জানাননি। পরে আমি সদর থানার ওসিকে ফোন দেই। ফোন দেয়ার কথা শুনে বাইরে থাকা আরডিসি (সিনিয়র সহকারী কমিশনার রাজস্ব) নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন লোকজন দরোজা ভেঙ্গে বাসায় ঢুকে। ঘরে ঢুকেই আরডিসি আমার মাথায় কিলঘুষি মারতে শুরু করেন। মারতে মারতে আমাকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে চোখ-হাত-পা বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে এনকাউন্টারে দিতে চায়। আমাকে বার বার বলে, তুই কলেমা পড়ে নে, তোকে এনকাউন্টারে দেয়া হবে। এসময় আমি অনুনয় করি’। এভাবে আরিফুল তার ওপর নির্যাতনের বিবরণ দিতে গিয়ে ডিসির অফিসে তাকে বিবস্ত্র করে বেধড়ক মারধর, অকথ্য ভাষায় গালাগালি ও বলপূর্বক স্বাক্ষর গ্রহণের কথা উল্লেখ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রীট মামলার শুনানী শেষে জনৈক ব্যারিস্টার বলেন, দেশের কিছু কিছু ডিসির আচরণ দেখে মনে হয়, তারা যেনো মোঘল সম্রাট। সরকারের কাছ থেকে বেতন নিয়ে তারা সরকারকেই বিপদে ফেলতেই ষড়যন্ত্র করছে।
অপরদিকে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু ডিসি নয়, এই ঘটনার সাথে অন্য যে সব কর্মকর্তা জড়িত ছিলো, নিজ নিজ ভূমিকা বিবেচনা নেয়া হবে। জনমনে শনিবার থেকে যতো প্রশ্ন ওঠেছে, সব প্রশ্নের সত্যতা তদন্তে পাওয়া গেছে। এক-দুইজন কর্মকর্তার দায় সরকার বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নেবে না।

উপরের ঘটনাটি নিঃসন্দেহে জনমনে ক্ষোভ ও ক্রোধ সৃষ্টিকারী। যারা আইনের লোক এবং সেই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের জনগণের শান্তি শৃংখলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদের আরচণ যদি মাস্তান ও সন্ত্রাসীদের মতো হয়, তবে দেশের জনগণের অবস্থা কী হবে, তা ভাবতে গায়ে কাঁটা দেয়, গা শিউরে ওঠে।

প্রশাসনের উচ্চপদস্থ লোকজন কর্তৃক সংঘটিত উপরোক্ত ঘটনাটি কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী হলেও নজিরবিহীন নয়। এদেশে আমলা ও ক্ষমতাসীন মহল কর্তৃক সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা বিস্তর ঘটনা ঘটেছে অতীতে। বিএনপি আমলে মন্ত্রী মীর্জা আব্বাস কর্তৃক সাংবাদিককে পিটিয়ে পঙ্গু করে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। বর্তমান সময়ে গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কোন্ পর্যায়ে আছে, তা বুঝতে বা জানতে গবেষণার প্রয়োজন নেই। অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ করায় এদেশের সাংবাদিকদের হুমকি প্রদান, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের কিংবা নির্যাতনের ঘটনা এদেশে অহরহ ঘটছে। তবে হ্যাঁ, মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ প্রকাশ করে ব্লাকমেইল, হয়রানি ও মানহানির ঘটনাও ঘটাতে দেখা যাচ্ছে এক শ্রেণীর অসৎ হলুদ সাংবাদিকদের, বিশেষভাবে কিছু অনলাইন পোর্টালে এ ধরণের অপকর্ম ও অপরাধ বেশী লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এদের অনৈতিক ও অসাংবাদিকসুলভ আচরণের দরুণ প্রকৃত সৎ সাংবাদিকেদের সীমাহীন লজ্জায় পড়তে হচ্ছে। যা-ই হোক উপরের সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাটি এখন আদালতে বিচারাধীন। আর জনগণের আদালতে ইতোমধ্যে চরমভাবে ধিকৃত। আর এটা প্রাথমিকভাবে সম্ভব হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকের কারণে। যদি আরিফুল ইসলামের ওপর নির্যাতনের ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে ফেইসবুকে না আসতো এবং জনগণ এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন না করতেন, তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আদৌ কোন পদক্ষেপ কিংবা এতো দ্রুত কোন পদক্ষেপ নিতো কি-না, এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। তা সত্বেও কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ। তবে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের অসৎ অসাধু ও মাস্তান প্রকৃতির আমলা কর্মকর্তাদের চক্রান্তের শিকার হয়ে তার জীবন ও জীবিকা এবং নিরাপত্তা যাতে বিপন্ন না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য সচেতন মহলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। এদিকে মনোযোগ আকর্ষণ করছি সংশ্লিষ্ট নেতা-মন্ত্রী ও প্রশাসনের সৎ ও বিবেকবান কর্মকর্তাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *