172 

ডেস্ক নিউজঃ ‘স্বাধীনতার সুখ’ শিরনামে বাবুই পাখি ও তার বাসা নিয়ে রজনী কান্ত সেনের লেখা একটি বিখ্যাত কবিতা। এমন গান, ছড়া ও কবিতা আছে অনেক। কিন্তু বাবুই পাখির কিচিরমিচির ডাক এখন আর শোনা যায় না। কারণ, পাখিটির প্রিয় বাসস্থল তালগাছও আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে।

ছোট্ট পাখি বাবুই মূলত তাল গাছেই তাদের বাসা বাঁধে এমনটি দেখা যায় আদিকাল থেকেই। শক্ত বুননের বাসা যেন শিল্পের এক অনন্য সৃষ্টি। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য তালগাছ যেমন এখন আর দেখা যায় না, তেমনি দেখা মেলে না কবি রজনী কান্ত সেনের লেখা কবিতার নায়ক বাবুই পাখিও।

গ্রামের মাঠের ধারে, পুকুর পাড়ে, নদীর ধারে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে শিল্পীমনা বাবুই পাখিও। কিচিরমিচির শব্দও এখন আর শোনা যায় না। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, কীটনাশকের ব্যবহার, শিকারিদের দৌরাত্ম্য অপিরকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণে মানব বসতি বাড়ায় ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের বিলুপ্ত হতে বসেছে।

ফরিদপুরে মধুখালী উপজেলার কোড়কদি ইউনিয়নের খোদাবাসপুর-মোল্যাডাঙ্গী গ্রামের মাঝখানের মাঠ। মাঠে কৃষকদের ফসলের ক্ষেত। মাঠের আশপাশে কয়েকটি তালগাছ দেখা যায়। এতে বাসা বুনতে ব্যস্ত বাবুই পাখিরা। সেই বাসা দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি মজবুত। প্রবল ঝড়েও তাদের বাসা ছিঁড়ে পড়ে না। গোধূলি বেলায় তালগাছগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে কান পাতলে সুরেলা কণ্ঠের কিচিরমিচির ডাক শোনা যায়। দেখা মেলে শৈল্পিক বাসায় সঙ্গিনীর সঙ্গে প্রণয়ের দৃশ্যও।

মধুখালী উপজেলার মোল্যাডাঙ্গী গ্রামের কৃষক মো. সলেমান শেখ বলেন, ‘এ মাঠে প্রায় ৬-৭ টি তাল গাছ রয়েছে। প্রতিবছর আমি তালগাছ থেকে রস সংগ্রহ করি। কিন্তু একটি গাছে পাখির বাসা থাকায় আমি সেই গাছটি কাটা থেকে বিরত থেকেছি। যাতে পাখিরা ভয়ে চলে না যায়।’

জমি ও তালগাছটির মালিক মো. আদার সেখ বলেন, ‘বহু আগে এগুলো (বাবুই পাখির বাসা) হরহামেশা দেখা গেলেও এখন আর চোখে পড়ে না। তালগাছও কমছে আর বৈ (বাবুই পাখি) তো চোখেই পড়ে না। হঠাৎ করেই কিছুদিন হলো মাঠের মধ্যে আমার তালগাছে পাখিগুলো বাসা বেঁধেছে।’

ফরিদপুরের চারণ কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মী বিজয় পোদ্দার বলেন, ‘আমাদের মাঝ থেকে তালগাছ ও বাবুই পাখি হারিয়ে যেতে বসেছে। পল্লী গ্রামে দু-চারটা তালগাছ চোখে পড়লেও বাবুই পাখির একেবারেই দেখা মেলে না। পুরো ফরিদপুর জেলা ঘুরে হয়তো হাতেগোনা ৮ থেকে ১০টি তালগাছে বাবুইপাখি ও তার বাসা দেখা যেতে পারে। আমাদের মাঝ থেকে বাবুই যেন বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে। একসময় হয়তো বইয়ের পাতায় আর গানের ভেতর ছাড়া চোখে দেখা মিলবে না।

এ প্রসঙ্গে মধুখালী উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. জাহিদুল রহমান বলেন, ‘অতিমাত্রায় বনভূমি ধ্বংস করার কারণে আজ জীববৈচিত্র্য বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। যে কারণে হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। সরকারি নির্দেশনায় পাখি নিধন ও তাদের আবাসস্থল ধ্বংসকারীদের কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। রাস্তার দুই ধারে গাছ লাগিয়ে আমরা পাখিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। এগুলো ধরে রাখতে হলে আমাদের যার যার জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে। তালগাছ রোপণ করা নির্বিচারে পাখি নিধন বন্ধ করা এবং তাদের আবাসস্থলে বাধা দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *